
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন আর কারাকাসের রাজপথে ডেল্টা ফোর্সের ঝটিকা অভিযান—শনিবার ভোররাতের এই নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে পতন ঘটল নিকোলাস মাদুরোর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস এখন যুক্তরাষ্ট্রের জিম্মায়।
পানামার ম্যানুয়েল নরিগা, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কিংবা হন্ডুরাসের জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের পর মাদুরো হলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়া সর্বশেষ রাষ্ট্রপ্রধান। এখন বিশ্বজুড়ে একটাই প্রশ্ন—মাদুরোর কপালে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে? ইতিহাস কী বলে?
অভিযানের নেপথ্যে: শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার সেনাঘাঁটি, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, মাদুরোকে আটককারী সেনাসদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই বোমাবর্ষণ করা হয়। সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, মার্কিন সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসদমন ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ এই অভিযান পরিচালনা করে।
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মূল অভিযোগ ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদ। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে মাদুরোর বিরুদ্ধে কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, মেশিনগান রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল ৫ কোটি ডলার।
ইতিহাসের আয়নায় মাদুরোর সম্ভাব্য পরিণতি: মাদুরোর ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে তাকাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়া পূর্বসূরিদের দিকে।
১. ম্যানুয়েল নরিগা (পানামা): ১৯৮৯ সালে মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলে পানামায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। জেনারেল নরিগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ‘মায়ামি কেলেঙ্কারিতে’ তার বিচার হয় এবং দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর ২০১৭ সালে পানামার কারাগারেই তার মৃত্যু হয়। মাদুরোর বিরুদ্ধেও নরিগার মতোই মাদক পাচারের হুবহু অভিযোগ এনেছেন ট্রাম্প।
২. সাদ্দাম হোসেন (ইরাক): ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের (যা পরে পাওয়া যায়নি) অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র। সাদ্দাম হোসেনকে গর্ত থেকে আটক করা হয়। পরে ইরাকি আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধে তার মৃত্যুদণ্ড হয় এবং ২০০৬ সালে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। মাদুরোর বিরুদ্ধেও সাদ্দামের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
৩. জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ (হন্ডুরাস): সদ্য সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে ২০২২ সালে মাদক ব্যবসার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক নাটকীয় মোড়ে ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন।
মাদুরোর জন্য ট্রাম্পের ছক কী? বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোর পরিণতি নরিগার মতো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাকে নিউইয়র্কের আদালতে বিচার করে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করায়, তার বিচার প্রক্রিয়া আরও কঠোর হতে পারে।
দোহার হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারাকাত আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই জোর করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। মাদুরোকে এভাবে আটক করা ভালো নজির নয়।’’
বাসচালক থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মাদুরো নিজেকে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের রক্ষক বলে দাবি করতেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘চক্ষুশূল’ এই নেতার শেষ গন্তব্য এখন মার্কিন আদালতের কাঠগড়া, নাকি অন্য কিছু—তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।
এম.এম/সকালবেলা