
তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের চা বাগানগুলোতে প্রায় ৯ হাজার শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চরম সংকটে। জেলার ৯২টি চা বাগানের মধ্যে ৬৯টিতেই নামমাত্র বেসরকারি বিদ্যালয় থাকলেও সেখানে নেই কোনো শিক্ষার পরিবেশ। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব বিদ্যালয় সরকারীকরণ না হওয়ায় এবং অবকাঠামোগত দৈন্যদশার কারণে চা শ্রমিক সন্তানদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে করুণ চিত্র:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দুর্গম সীমান্তবর্তী সুনছড়া (দেবল ছড়া) চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে দেখা যায় শিক্ষার করুণ হাল। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত (কাগজপত্রে ১৯৮০) এই বিদ্যালয়টি এখন একটি ভাঙা টিনশেড ঘর। সেই ঘরটিও হেলে পড়েছে। জায়গা সংকটে একই ঘরে বাঁশের বেড়া দিয়ে দুটি শ্রেণিকক্ষ করা হয়েছে, আর বাকি ক্লাস নেওয়া হচ্ছে পাশের হেড ক্লার্কের বাংলোর বারান্দায়। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র ৩ জন। শিক্ষার্থীদের পরনে নেই স্কুল ড্রেস, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ।
ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক:
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভাব-অনটন আর সুযোগ-সুবিধার অভাবে প্রাথমিকে ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়লেও মাধ্যমিকে গিয়ে এই হার দাঁড়ায় ৭০-৮০ শতাংশে। অভিভাবকরা বলছেন, ‘‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচ চালানো অসম্ভব। প্রতিটি বাগানে সরকারি স্কুল ও উপবৃত্তি চালু করা জরুরি।’’
শিক্ষকদের মানবেতর জীবন:
সুনছড়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিটুন কুর্মী জানান, চা শ্রমিকদের মজুরির সমান সম্মানী পান শিক্ষকরা। কোনো কোনো শিক্ষকের মাসিক সম্মানী মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। অনেক কষ্ট করে বাচ্চাদের ক্লাস করাতে হচ্ছে।’’
বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও চা শ্রমিক জীবন নিয়ে গবেষক ড. আশরাফুল করিম বলেন, ‘‘১৯৭৭ সালের আইন অনুযায়ী প্রতিটি বাগানে একটি করে স্কুল থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। চা শ্রমিকরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, তাদের প্রতি এই বৈষম্য দূর করা সরকারের দায়িত্ব।’’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘‘স্কুলগুলোর করুণ পরিণতি নিয়ে বারবার স্মারকলিপি দিয়েছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।’’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সফিউল আলম জানান, চা বাগানের স্কুলগুলো সরকারি করার সুযোগ আছে, তবে তা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘‘সুনির্দিষ্টভাবে কোনো বিদ্যালয় আবেদন করলে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।’’
এম.এম/সকালবেলা