আন্তর্জাতিক ডেস্ক: একসময় তিনি কারাকাসের রাস্তায় বাস চালাতেন, যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া তুলতেন। সেই তিনিই একদিন বসেছিলেন ভেনেজুয়েলার মসনদে। দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসন করেছেন প্রায় এক যুগ। ১২ বছরের সেই শাসনের অবসান ঘটল আজ মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের হাতে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু কে এই নিকোলাস মাদুরো? কীভাবে একজন সাধারণ পরিবহন শ্রমিক থেকে তিনি হয়ে উঠলেন লাতিন আমেরিকার অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ক?
লক্করঝক্কর বাসের চালক থেকে রাজনীতিতে: ১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর এক সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম মাদুরোর। বাবা ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। বাবার আদর্শেই বড় হয়েছেন। ১৯৯২ সালে যখন ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজ ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান ঘটান, তখন মাদুরো ছিলেন কারাকাসের মেট্রো বাস সার্ভিসের একজন সাধারণ চালক। চালকের আসনে বসেই তিনি জড়িয়ে পড়েন ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতিতে।
চাভেজের ‘মানসপুত্র’: হুগো চাভেজের কারাবরণই মাদুরোর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাস চালক মাদুরো চাভেজের মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নামেন, লিফলেট বিলি করেন এবং ক্যাম্পেইন চালান। জেল থেকে বের হওয়ার পর চাভেজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচরে পরিণত হন তিনি। চাভেজ তাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে, ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মাদুরোকে জাতীয় পরিষদের স্পিকার এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেন। মাদুরো বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন চাভেজের ‘তেল কূটনীতি’র ফেরিওয়ালা হিসেবে।
‘সবুজ জুস’ ও ক্ষমতার মসনদ: ২০১২ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হুগো চাভেজ মৃত্যুর আগে মাদুরোকেই নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা করে যান। ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন মাদুরো। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি প্রায়ই হাতে ‘সবুজ জুস’ নিয়ে ঘুরতেন এবং এর স্বাস্থ্যগুণের কথা বলতেন, যা তাকে এক অদ্ভুত পরিচিতি এনে দেয়। তিনি নিজেকে দাবি করতেন চাভেজের ‘প্রকৃত উত্তরাধিকারী’ হিসেবে।
অর্থনৈতিক ধস ও স্বৈরশাসক উপাধি: বাস চালানোর দক্ষতা থাকলেও দেশ চালানোর দক্ষতায় তিনি ব্যর্থতার পরিচয় দেন বলে মনে করেন সমালোচকরা। তার আমলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে ধস নামে। একসময়ের ধনী দেশটি নিমজ্জিত হয় চরম দারিদ্র্য, মুদ্রাস্ফীতি আর খাদ্য সংকটে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। বিরোধীদের দমন করতে তিনি কঠোর পথ বেছে নেন। বিরোধীদের তিনি ‘ফ্যাসিস্ট দানব’ বলে বিদ্রুপ করতেন। একের পর এক বিতর্কিত ও কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন।
৫০ মিলিয়ন ডলারের ফেরারি: যে মাদুরো একসময় বাস চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, শেষ জীবনে তার মাথার দাম ওঠে ৫ কোটি ডলার (৫০ মিলিয়ন)। মাদক পাচার, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর এই বিশাল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
অবশেষে ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি মার্কিন অভিযানের মধ্য দিয়ে যবনিকাপাত ঘটল বাসচালক থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া নিকোলাস মাদুরোর নাটকীয় অধ্যায়ের।
এম.এম/সকালবেলা
মন্তব্য করুন