মোস্তাফিজুর রহমান (কয়রা, খুলনা):
খুলনার কয়রা উপজেলায় গত অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ছয় মাস আগেই কাজ শেষ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলেও মাঠপর্যায়ে অনেক প্রকল্পের কোনো অস্তিত্বই নেই। বরাদ্দের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং বিল উত্তোলনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, প্রকল্প অনুমোদন থেকে বিল উত্তোলন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অনিয়মে ভরপুর। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-চাল) কর্মসূচির আওতায় মহারাজপুর ইউনিয়নের পশ্চিম দেয়াড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আয়শার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়নে ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ প্রকল্প গ্রহণের পর কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্প সভাপতি সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য আমেনা খাতুন জানান, বিষয়টি তার ছেলে দেখাশোনা করেন। তার ছেলে আরাফাত হোসেন বলেন, সেখানে তারা কোনো কাজ করেননি।
মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, চলতি বছরে সেখানে কোনো কাজ হয়নি এবং সব বিলও উত্তোলন করা হয়নি।
একই ইউনিয়নে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় দেয়াড়া বড়বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পুকুরঘাট নির্মাণে ৪ লাখ ২২ হাজার ৬২০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান জানান, অর্ধেক টাকা উত্তোলনের পর সমস্যার কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া কাবিখা-গম কর্মসূচির আওতায় কয়রা সদর ইউনিয়নের সুশীল মণ্ডলের বাড়ি থেকে হরি মন্দির পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়নে ৭ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে সামান্য বালু ফেলা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাবিটা-কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতাধীন ৬০৫টি প্রকল্পের অধিকাংশেই বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়নি। কোথাও আংশিক কাজ করে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে, আবার কোথাও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পগুলোর অধিকাংশে সাইনবোর্ড নেই, শ্রমিকের পরিবর্তে মেশিন ব্যবহার করে কাজ দেখানো হয়েছে এবং কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাস্তবায়ন হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিটি প্রকল্প থেকে পিআইও অফিসে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়েছে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, তদারকি সংস্থাগুলো কমিশন বাণিজ্যে জড়িত থাকলে কাজের মান নিশ্চিত হয় না। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের যোগসাজশে বরাদ্দ লুটপাট হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এ বিষয়ে সদ্য যোগদানকৃত কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী কাজ করতে হবে। যেসব প্রকল্পে কাজ শুরু হয়নি, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। কেউ কাজ না করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন