আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
“চামড়ায় প্রথম দাগটা উঠেছিল তিন বছর আগে। গায়ে জ্বর, শরীর ব্যথা -তারপর ধীরে ধীরে হাত-পায়ের অনুভূতি হারিয়ে ফেলি। চিমটি কাটলেও বুঝতে পারতাম না কিছু।” এভাবে বলছিলেন সাতক্ষীরা শহরের ৩৮ বছর বয়সি মেহেরুন্নেসা (ছদ্মনাম)।
তিনি জানান, ‘প্রথমে কেউই ধরতে পারেনি এটা কী ধরনের রোগ। স্থানীয় ডাক্তার বলেছিলেন চর্ম রোগ। পরে ভারতের এক চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারি-আমি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত।’
রোগটি ধরতে দেরি হওয়ায় তার শরীরে গুটি গুটি দাগ ওঠে, একপর্যায়ে মাংস পচে যায়। তবুও চিকিৎসা নিতে লজ্জা পাননি, কিন্তু সমাজের অবহেলা তাকে কষ্ট দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। “প্রতিবেশী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমার সঙ্গে খেতে চাইত না। আমি যে পুকুরে গোসল করতাম, সেখানে আর কেউ নামত না,”- বলতে থেমে গেলেন তিনি।
তবে সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে। “এটা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। ওষুধ খেলে ভালো হয়ে যায়। সঠিক সময়ে রোগ ধরা পড়লে অঙ্গহানি হয় না,” - বলেন মেহেরুন্নেসা।
অবহেলা আর দেরিতেই বাড়ে কষ্ট মেহেরুন্নেসার মতো অভিজ্ঞতা রয়েছে সাতক্ষীরা পৌরসভার কুখরালি এলাকায় বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সি রহিমা খাতুনের (ছদ্মনাম)। কুষ্ঠরোগ ধরা পড়তে তারও দেরি হয়।
“আমার দুই হাতে দশটা আঙুল আর পায়ে তিনটা আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, কেউ কাছে আসত না,”- বললেন রহিমা।
এখন তিনি নিয়মিত ওষুধ খান এবং সরকারি টিবি-লেপ্রসি প্রোগ্রামের মাধ্যমে চিকিৎসা নিচ্ছেন। “মানুষ এখন আর আগের মতো অবহেলা করে না,” বললেন রহিমা একটুখানি হাসি দিয়ে।
জেলায় রোগীর সংখ্যা ও প্রবণতা :
বেসরকারি সংস্থা সিএসএস (খ্রিষ্টান সার্ভিস সোসাইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় কুষ্ঠরোগ শনাক্তের প্রবণতা গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বেসরকারি সংস্থা সিএসএস এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে সাতক্ষীরা ২ জন, বাগেরহাট ৫ জন; ২০২০ সালে সাতক্ষীরা ১২ জন, বাগেরহাট ০ জন; ২০২১ সালে সাতক্ষীরা ২৯জন, বাগেরহাট ৩১জন; ২০২২ সালে সাতক্ষীরা ৫০ জন, বাগেরহাট ৭৬ জন; ২০২৩ সালে সাতক্ষীরা ৪৯ জন, বাগেরহাট ৯২ জন; ২০২৪ সালে সাতক্ষীরা ৬৮ জন বাগেরহাট ১০১ জন এবং ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সাতক্ষীরা ৩৫ ও বাগেরহাটে ৭৪ জন কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বর্তমানে সাতক্ষীরায় চিকিৎসাধীন আছেন ৫১ জনের মধ্যে কালীগঞ্জে ৩৯ জন, আশাশুনিতে ১১ জন এবং সদরে একজন। সিভিল সার্জন অফিস জানায়, রোগী শনাক্ত ও ওষুধ বিতরণে সিএসএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সামাজিক কুসংস্কার ভাঙছে, বাড়ছে সচেতনতা :
সাতক্ষীরার জেলা কুষ্ঠ ও টিবি নজরদারি চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. ইব্রাহিম হাওলাদার বলেন, “আগে মানুষ কুষ্ঠরোগী দেখলেই ভয় পেত, এখন আর তেমনটা নেই। ইমাম, স্থানীয় প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোয় কুসংস্কার অনেকটাই কমেছে।”
তিনি আরও বলেন, “কালীগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলায় কুষ্ঠ শনাক্তের হার তুলনামূলক বেশি, কারণ সেখানে সিএসএস ও অন্যান্য সংস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। রোগী সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে, কারণ এখন বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হয়, ফলে অঙ্গহানির ঘটনা কমেছে এবং রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।
কুষ্ঠ কোনো অভিশাপ নয়-এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য। সমস্যা হলো, অনেকেই ভয় বা লজ্জার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন বা মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। অথচ মাল্টিড্রাগ থেরাপি (গউঞ) পুরো মেয়াদে চালালে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এখন মানুষ কুষ্ঠরোগকে ভয় না পেয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে-এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।”
বাংলাদেশে কুষ্ঠের সামগ্রিক চিত্র :
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩-৪ হাজার নতুন কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হচ্ছেন। ২০১৫ সালে শনাক্ত হয় ৩,৯৭৬ জন, আর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি কমে দাঁড়ায় ৩,৫১৯ জনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আশাব্যঞ্জক প্রবণতা হলেও রোগী শনাক্তে দেরি ও সামাজিক ভয় এখনো বড় বাধা।
রোগ ছড়ানোর ধরণ ও চিকিৎসা :
কুষ্ঠরোগ মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রাই নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। মুখ ও নাকের ড্রপলেটের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলে এটি ছড়াতে পারে, তবে সাধারণ ছোঁয়া, একসঙ্গে খাওয়া বা হাত মেলানোর মাধ্যমে নয়। চিকিৎসা শুরু করলেই রোগীর মাধ্যমে সংক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি :
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় সাতক্ষীরার নোনা পানি, নিম্ন আয়ের জীবন ও পুষ্টিহীনতা কুষ্ঠের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর পরিবার বা সমাজের অবহেলা রোগীদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
মেহেরুন্নেসা বলেন, “রোগ ধরার পর আমার রাতের খাবার কেউ খেত না, আমি যে পুকুরে গোসল করতাম সেখানে কেউ নামত না।”
বাড়ছে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা :
সাতক্ষীরায় কুষ্ঠ নির্মূলে একযোগে কাজ করছে সিএসএস (খ্রিষ্টান সার্ভিস সোসাইটি), দ্য লেপ্রসি মিশন বাংলাদেশ ও সিভিল সার্জন অফিস।
সিএসএস-এর প্রজেক্ট অফিসার মো. খালেকুজ্জামান বলেন, “কুষ্ঠ নির্মূলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করছে। আমরা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের প্রতিটি উপজেলায় সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আক্রান্তদের বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা দেওয়া হয়।”
জেলা সিভিল সার্জন মো. আব্দুস সালাম বলেন, “কুষ্ঠ এখন আর ভয় পাওয়ার মতো রোগ নয়—এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। সরকারিভাবে প্রতিটি উপজেলায় প্রশিক্ষিত জনবল ও পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে। সিএসএস এনজিওর সহযোগিতায় রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।
কুষ্ঠ নিয়ে সমাজে কিছু কুসংস্কার এখনো আছে, এজন্য আমরা নিয়মিত সচেতনতা সেমিনার, উঠান বৈঠক ও প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যাতে কেউ আর ভয় বা লজ্জার কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।
চিকিৎসা নিলে কুষ্ঠে অঙ্গহানি হয় না। আগে মানুষ লজ্জা ও ভয়ের কারণে চিকিৎসা নিতে চাইত না, কিন্তু এখন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে অনেক কাজ হচ্ছে। পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ আছে এবং প্রতিটি রোগী নিয়মিত নজরদারিতে রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগীর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা।”
সকালবেলা/এমএইচ